• আমাদের অনুসরণ করো
দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসার ইতিহাসও তেমনই এক আলোকিত অধ্যায়, যার প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে আত্মত্যাগ, শ্রম, দোয়া, সংগ্রাম এবং কুরআনের খেদমতের এক অবিরাম সাধনা।
 
আজ যে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার অসংখ্য শিশু-কিশোরের কুরআনী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতাদের দৃঢ় সংকল্প, দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা এবং এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা সেই ক্ষুদ্র চারাগাছকে আজ একটি ফলদায়ক বৃক্ষে পরিণত করেছে, আলহামদুলিল্লাহ।
 
এই ইতিহাস শুধু একটি মাদ্রাসার নয়; এটি একটি জনপদের ঈমানি আবেগ, একটি সমাজের দ্বীনি চেতনা এবং অসংখ্য মানুষের সদকায়ে জারিয়ার জীবন্ত সাক্ষ্য।
 

প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও পরিচয়ের বিবর্তন

প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে মাদ্রাসার নাম ছিল—"দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া কিরাআতুল কুরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা"
 
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নামের সাথে "কেরামতিয়া" শব্দটি যুক্ত করা হয়।
 
তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দীর্ঘ নামের পরিবর্তে সহজ, শ্রুতিমধুর এবং সর্বসাধারণের নিকট অধিক পরিচিত একটি নামের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে নামটি সংক্ষিপ্ত করে রাখা হয়—
 
"দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা"বর্তমানে এই নামেই প্রতিষ্ঠানটি সর্বাধিক পরিচিত এবং পরিচিতির নতুন মাত্রা অর্জন করেছে।
 

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস একটি স্বপ্নের সূচনা 

২০১২ সালের ১লা জানুয়ারি দক্ষিণ কর্পূরকাঠী অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা।

এই প্রতিষ্ঠানের সূচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সম্মানিত আলেমে দ্বীন—
 

স্বপ্নদ্রষ্টা

হাফেজ ক্বারী মুহাম্মাদ বেলাল হোসাইন (দা.বা.)
প্রথম দায়িত্ব গ্রহণের তারিখঃ ০১/০১/২০১২ ইং
 
তাঁর দূরদর্শী চিন্তা, কুরআনের খেদমতের আকাঙ্ক্ষা এবং নিরলস পরিশ্রমের ফলেই এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বাস্তব রূপ লাভ করে।
 
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি; বরং এমন একটি পরিবেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে কুরআনের আলোয় আলোকিত একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে উঠবে।
 
প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি নিজ হাতে বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করেছেন। মাদ্রাসার অবকাঠামো নির্মাণ, ছাত্র সংগ্রহ, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর আত্মত্যাগ আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
 

জমিদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের অবদান

কোনো প্রতিষ্ঠান একক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না। একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতা।
 
দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসার জমি প্রদানকারী, নির্মাণ সহযোগী, অর্থদাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের অবদান এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
 

জমিদাতাগণের নাম
১। মরহুম আবুল হোসেন হাওলাদার ২। মরহুম নূরু হাওলাদার ৩। মরহুমা মাজেদা বেগম ৪। .............................................. ৫। ..............................................

 
মহান আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই মহৎ অবদানকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।
 

নির্মাণযোদ্ধা ও প্রতিষ্ঠাকালীন সহযোগীগণ

প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময়ে অসংখ্য মানুষ নিজ হাতে শ্রম দিয়েছেন।
 
কেউ মাটি কেটেছেন, কেউ ঘর নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছেন, কেউ কাঠ, বাঁশ ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছেন, আবার কেউ অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করেছেন।
 
তাদের এই অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
 

অত্র মাদরাসার সাবেক শিক্ষকবৃন্দ

 
১। হাফেজ আমির হোসেন সাহেব ২। ক্বারী মনির হোসেন সাহেব ৩। ক্বারী নূরুজ্জামান সাহেব ৪। হাফেজ আঃ রহিম সাহেব ৫। হাফেজ অহিদুল ইসলাম সাহেব ৬। জনাব সোহান স্যার
 
মাদরাসার বর্তমান শিক্ষকবৃন্দ
১। হাফেজ ক্বারী মোঃ বেলাল হোছাইন ২। হাফেজ মাওঃ আমিন আল হাসান ৩। হাফেজ আব্দুল্লাহ বিন বশার
 
শিক্ষা সংস্কার ও নবজাগরণের অভিযাত্রা ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
 
প্রতিটি যুগের নিজস্ব চাহিদা রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের বহুমুখী যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পায়।
 
দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসার বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ উপলব্ধি করে যে, শুধুমাত্র হিফজ শিক্ষা নয়; বরং কুরআনের পাশাপাশি আদর্শ চরিত্র, সামাজিক সচেতনতা, গবেষণামনস্কতা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটানো সময়ের দাবি। এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় নতুন শিক্ষা সংস্কারের যাত্রা।
 
শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কার
 
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সফলতার অন্যতম ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মাদ্রাসায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।
 
শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
 
একইসাথে শিক্ষকদের জন্য পাঠ পরিকল্পনা, নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
 
মাসিক মূল্যায়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন
 
পূর্বে বার্ষিক বা সাময়িক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হলেও বর্তমানে নিয়মিত মাসিক মূল্যায়ন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
 
এর ফলে—
 
• শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
• দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।
• অভিভাবকদের নিকট শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরা সহজ হয়েছে।
• শিক্ষার্থীদের মাঝে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
 
আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন
 
বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মাদ্রাসার প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা হয়েছে।
 
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম
বর্তমানে নিম্নোক্ত কার্যক্রম ধাপে ধাপে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হচ্ছে—
 
✓ শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ
✓ ভর্তি ব্যবস্থাপনা
✓ উপস্থিতি রেকর্ড
✓ পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুতকরণ
✓ অফিস ব্যবস্থাপনা
✓ অভিভাবক যোগাযোগ ব্যবস্থা
✓ আর্থিক হিসাব সংরক্ষণ
 
আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যারভিত্তিক মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করা।
 
অফিসিয়াল ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা
 
ডিজিটাল যুগের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মাদ্রাসার নিজস্ব অফিসিয়াল ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
 
এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে—
 
• প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস • শিক্ষক পরিচিতি • শিক্ষার্থীদের ফলাফল • গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি • শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতিবেদন • দাওয়াহ ও ইসলামী সাহিত্য ক্রমশ প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
 
এর মাধ্যমে মাদ্রাসা নতুন প্রজন্মের সাথে আরও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।
 
 
মাদ্রাসার কৃতী শিক্ষার্থী ও ফারেগীন
 
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।
 
তাদের মধ্যে অনেকে আজ বিভিন্ন মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত, কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত আছেন।
 
ফারেগীন ও কৃতী শিক্ষার্থীগণের তালিকা প্রয়োজন অনুসারে নাম সংযোজন করা হবে ইনশাআল্লাহ
 

ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা

 
আমাদের স্বপ্ন অনেক বড়। আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই, যা কেবল একটি হিফজখানা নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হবে।
 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—

 
(১) পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা। (২) উন্নত মানের হিফজ ও কিরাআত বিভাগ (৩) হিফজোত্তর বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স (৪) অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। (৫) বার্ষিক সাবেক ছাত্র সম্মেলন (৬) আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ (৭) ৩১৩ বদরী সদস্য তৈরি করা (৮) দ্বীন, আখলাক, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
 

উপসংহার

দক্ষিণ কর্পূরকাঠী মুহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি ইতিহাস, একটি ঐতিহ্য, একটি আমানত এবং একটি চলমান স্বপ্নের নাম।
 
এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি কুরআনের পৃষ্ঠা এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ, দোয়া ও ভালোবাসা।
 
আমরা মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন এই প্রতিষ্ঠানকে কিয়ামত পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহর খেদমতের জন্য কবুল করেন এবং এর সাথে সম্পৃক্ত সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করেন।
 
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।


পরবর্তী পর্ব আসছে ইনশাআল্লাহ..............
 
 
×